মায়ের হাতে ব্যাগ দিয়েই চিরতরে হারিয়ে গেল ছোট্ট কলি! পাবনায় অবুঝ শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার, কাঁদছে আকাশ-বাতাস

"স্যার, আমার মেয়েটাকে একটু খুঁজে দেন না! ও তো কখনো আমাকে ছেড়ে এতক্ষণ থাকে না..."

পাবনা সদরের এক গরিব কৃষকের এই বুকফাটা হাহাকার গত কয়েকদিন ধরে বাতাসে ভেসে বেড়িয়েছে। কিন্তু কে শোনে কার কথা? গরিবের কান্নার আওয়াজ কি আসলেই ক্ষমতাবানদের দেয়াল ভেদ করতে পারে? মাত্র ১০ বছরের এক ফুটফুটে শিশু, যার চোখে ছিল হাজারো রঙিন স্বপ্ন, তাকে যে এমন পৈশাচিক নিষ্ঠুরতায় পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হবে— তা হয়তো পাষাণ হৃদয়কেও কাঁদিয়ে ছাড়বে। আসুন, এক দুর্ভাগা বাবার চোখের জল আর আমাদের ঘুণে ধরা সমাজের এক নির্মম অধ্যায়ের সাক্ষী হই।

যে বিকেলটা আর সকাল হয়নি ছোট্ট কলির জীবনে
পাবনা সদরের আল-ফালাহ স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী কামরুন্নাহার কলি। বয়স মাত্র ১০ বছর। সেদিন বাবার হাত ধরে হাসতে হাসতে বাজার থেকে ফিরেছিল সে। সংসারের টুকিটাকি কেনাকাটার ব্যাগটা মায়ের হাতে সঁপে দিয়ে বলেছিল, "মা, আমি একটু সামনের দোকান থেকে আসছি।"
— ওই যাওয়াই যে শেষ যাওয়া হবে, কে জানতো? বাড়ির পাশের ওই ছোট্ট দোকানটিই যে একটা আস্ত কসাইখানা হয়ে উঠবে, তা ঘুণাক্ষরেও টের পায়নি কলির পরিবার। মেয়ে আর ফিরল না। শুরু হলো এক অসহায় বাবা-মায়ের অন্তহীন অপেক্ষা।

নরপশুদের থাবায় পিষ্ট এক মুকুল
দোকানে যাওয়ার পর পরই শিশুটির ওপর নজর পড়ে পাষণ্ড দোকানদার এবং তার এক সহযোগীর। অবুঝ শিশুটি যখন কিছুই বুঝে উঠতে পারেনি, তখন ওই দুই নরপশু মিলে তার ওপর চালায় পাশবিক নির্যাতন। ছোট্ট শরীরের আর্তনাদ যাতে কেউ শুনতে না পায়, তাই নির্মমভাবে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় তাকে।

কী বীভৎস তাদের চিন্তা! ঘটনা ধামাচাপা দিতে শিশুটির নিথর দেহ একটি বস্তায় ভরে তারা ফেলে রাখে নিজেদের বাড়ির পেছনের এক নর্দমাযুক্ত ডোবায়।

গরিবের আর্তনাদ বনাম প্রশাসনের 'বধির' কান
মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর পাগলপ্রায় বাবা টানা পাঁচ দিন প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন। তার অভিযোগ, "প্রশাসনের কাছে আমি পাঁচ দিন ঘুরেছি, কেউ সময় দেয় নাই, গুরুত্ব দেয় নাই...!"
— সম্ভাব্য সব তথ্য দেওয়ার পরও পুলিশ শুধু তাদের বাড়িতে এসে ঘুরে গেছে। কলি যদি আজ কোনো কোটিপতির সন্তান হতো, তবে কি প্রশাসন এতটা নির্লিপ্ত থাকতে পারত? প্রথম দিনেই কি পুরো এলাকা চষে ফেলা হতো না? এই প্রশ্নগুলো আজ পাবনার আকাশে-বাতাসে ঘুরপাক খাচ্ছে।

অবশেষে দুর্গন্ধ জানালো মর্মান্তিক সত্য
টানা ৭ দিন নর্দমার পচা পানিতে পড়ে ছিল কলির বস্তাবন্দি লাশ। যখন লাশে পচন ধরে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করে, তখন আশেপাশের মানুষের সন্দেহ হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং সেই দুর্গন্ধের সূত্র ধরেই ডোবা থেকে উদ্ধার করে শিশুটির গলিত দেহ!
লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে সেই লোমহর্ষক সত্য। পরে পুলিশের অভিযানে গ্রেফতার হয় ওই দুই ঘাতক।

ক্ষোভে ফুঁসছে জনতা: ঘেরাও এবং ভাঙচুর
এই পৈশাচিক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়তেই পাবনার সাধারণ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। এলাকার ক্ষুব্ধ জনতা ও প্রতিবেশীরা রাস্তায় নেমে আসেন। ইতিমধ্যেই ওই দুই নরপশুর বাড়ি ঘেরাও করে ব্যাপক ভাঙচুর চালিয়েছে বিক্ষুব্ধ মানুষ।
তাদের একটাই দাবি— "যে মাটিতে দাঁড়িয়ে তারা ১০ বছরের একটা অবুঝ শিশুকে ছিঁড়ে খেয়েছে, সেই মাটিতে তাদের কোনো অস্তিত্ব থাকতে দেওয়া হবে না!" জনতা আজ যেন নিজেরাই বিচারক হয়ে উঠেছে।


🛡️ আমাদের শিক্ষণীয়: চোখের আড়াল মানেই কি জীবনের আড়াল?

ছোট্ট কলির এই মর্মান্তিক বিদায় আমাদের সমাজের এক ভয়ঙ্কর রূঢ় বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিচ্ছে— আমাদের শিশুরা আজ কোথাও নিরাপদ নয়। এই ঘটনা থেকে প্রতিটি অভিভাবকের শিক্ষা নেওয়া উচিত:

  • নিরাপত্তার বলয়: সন্তান যতই পরিচিত জায়গায় বা বাড়ির পাশের দোকানে যাক না কেন, তাকে একা ছাড়বেন না।

  • সচেতনতা তৈরি: শিশুদের 'গুড টাচ' এবং 'ব্যাড টাচ' সম্পর্কে সচেতন করুন। কেউ খারাপ উদ্দেশ্যে কাছে এলে কীভাবে চিৎকার করতে হবে বা পালিয়ে আসতে হবে, তা শিখিয়ে দিন।

  • সামাজিক প্রতিরোধ: এলাকায় সন্দেহভাজন বা বখাটেদের আনাগোনা দেখলে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন।
    আজ কলি হারিয়ে গেছে, কিন্তু এমন ভাগ্য যেন আর কোনো শিশুর না হয়, তার জন্য আমাদের সবার সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।